সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ০৪:৪৯ পূর্বাহ্ন

বহু ঘটনার সাক্ষী যমুনা ছাড়লেন ড. ইউনূস

বহু ঘটনার সাক্ষী যমুনা ছাড়লেন ড. ইউনূস

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা। রাজধানীর মিন্টো রোডে বিশালা কৃতির এ ছায়াশীতল বাংলোটি বাংলাদেশের ইতিহাসের বহু চড়াই-উতরাইয়ের নীরব সাক্ষী। ১৮ মাস ধরে এ ভবনটিই ছিল দেশের প্রায় সবকিছুর প্রাণকেন্দ্র। সেখান থেকেই নেওয়া হয় অনেক ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এখন সেখানে এক ভিন্ন আবহ।

আগের মতো নেই কর্মব্যস্ততা। যেন সুনসান নীরবতা। দীর্ঘ ৫৪৮ দিনের এক বর্ণিল ও ‘ঝোড়ো সফর’ শেষে গতকাল শনিবার যমুনা ছেড়ে নিজের গুলশানের বাসায় উঠেছেন সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

এদিকে নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যমুনায় ওঠার ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি আপাতত গুলশানের বাসভবনেই থাকবেন বলে সূত্র জানিয়েছে। যদিও সম্প্রতি জানানো হয়েছিল, ড. মুহাম্মদ ইউনূস যমুনা ছাড়লে প্রধানমন্ত্রী ওই বাসায় উঠবেন।

দেশের এক চরম ক্রান্তিলগ্নে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ‘রাজনীতিতে অতিথি’ হয়ে এসেছিলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস। দেড় বছরে ড. ইউনূস সরকারকে মোকাবিলা করতে হয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। অবশ্য যখনই তিনি কোনো সংকট আঁচ করতেন, তখনই প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের যমুনায় ডেকে নিয়ে মতবিনিময় করতেন; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের উপায় স্থির করতেন।

মাঝে মধ্যে রাজনীতিবিদরা প্রধান উপদেষ্টার কর্মকাণ্ডে অভিমানও করতেন। অবশেষে সব সমালোচনা ছাপিয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এটিই ড. ইউনূস সরকারের সবচেয়ে বড় সফলতা।

এ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে বিএনপি। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। গতকাল যখন ড. ইউনূস তার সরকারি বাসভবন ছেড়ে যান, তখন পেছনে রেখে গেছেন একটি সফল নির্বাচনের সার্থকতা এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের নতুন এক পথচিত্র।

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর যমুনায় ওঠেন মুহাম্মদ ইউনূস। এর আগে ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তৎকালীন প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান এবং ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা লতিফুর রহমান তাদের দায়িত্বের দিনগুলোতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যুমনাতেই ছিলেন। ২০০৭ সালে এক-এগারোর পটপরিবর্তনের পর সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদও এ ভবনে থেকেছেন।

২০২৪ সালের সেই উত্তাল জুলাই-আগস্টের পর যখন ড. ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন, তখন চারদিকে ছিল অনিশ্চয়তা। রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার আর সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি ছিল আকাশচুম্বী। দায়িত্ব নিয়েই তিনি ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা সামাল দিতে মনোযোগী হন। বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশন প্রতিটি স্তরে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষ করে নির্বাচনের আগেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকে চব্বিশের অভ্যুত্থানে গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ছাত্রলীগকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের চূড়ান্ত ফসল হিসেবেই গত মাসে অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বড় রকমের কারচুপি বা দুর্ঘটনা ছাড়া এবং পেশিশক্তির প্রভাবমুক্ত একটি স্বচ্ছ নির্বাচন উপহার দিয়ে তিনি বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছেন, সদিচ্ছা থাকলে পরিবর্তন সম্ভব। ড. ইউনূসের এই দেড় বছর ছিল মূলত ‘সেতুবন্ধ’, যা স্বৈরাচারী ব্যবস্থা থেকে একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে দেশকে নিয়ে গেছে।

যমুনা কেবল একটি ভবন নয়, এটি ক্ষমতার পালাবদলের এক প্রতীক। ড. ইউনূসের বিদায়লগ্নে যমুনার প্রতিটি কক্ষ যেন বলছে এক নির্মোহ ত্যাগের গল্প। তিনি এসেছিলেন প্রয়োজনের তাগিদে, আর ফিরে গেছেন জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়া প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা বুঝিয়ে দিয়ে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ‘বিরল দৃষ্টান্ত’।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ড. ইউনূস রাজনীতির অতিথি হিসেবে এসেছিলেন। তবে তার কর্মকাণ্ড সবার ভালো লাগবে বিষয়টি—এমন নয়। কিন্তু তিনি দেশ ও জনগণের কল্যাণ হয়—এমন সব কাজের চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি একজন স্বজন হয়েই ঠাঁই পাবেন।

ড. ইউনূস সরকারের উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের ব্যানারে দেশজুড়ে তুমুল আন্দোলন গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে সেই আন্দোলন পরিণত হয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের ‘একদফা’ দাবিতে। একদিকে সরকারের কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে তুমুল আন্দোলন। অতঃপর, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। সে সময় ফ্রান্সে ছিলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস।

বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের অনুরোধে তার নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বিগত দেড় বছরে দেশের এক চরম সংকটময় মুহূর্তে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল এই সরকার। ১৮ মাসে তারা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং দেশের অগ্রযাত্রায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে—জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও জুলাই সনদ প্রণয়ন। বিএনপি-জামায়াতসহ দেশের ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন ঐকমত্য কমিশনে প্রায় ৯ মাসের বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে ৭২টি বৈঠকে অংশ নেয়। এরপর কয়েকটি ভিন্নমতসহ মোট ৮৪টি সুপারিশ সংবলিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ প্রণয়ন করা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাক্ষর করে সব দল। সে সময় শুধু জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং গণফোরাম স্বাক্ষর করেনি। পরে দুই দলই স্বাক্ষর করেছে।

এ ছাড়া বিচার বিভাগের সংস্কার, দুর্নীতি প্রতিরোধের উদ্যোগ, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ড. ইউনূসের সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা। তারা নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করে এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করে। এবারই প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের ভোটাধিকার দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটের ব্যবস্থা করা হয়।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের ১৮ মাসের শাসনামলে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং দেশের অগ্রযাত্রায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। তাদের এই অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তারা দেশের গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করতে এবং একটি দুর্নীতিমুক্ত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

ড. ইউনূসের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধির বৈঠক: অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে একটি প্রতিনিধিদল। গতকাল বিকেল ৩টায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম শামছুল ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎ করে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং এ তথ্য জানায়। প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা হলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার ও প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ তারিক।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস যখন যমুনা থেকে বিদায় নিলেন, তখন রেখে গেছেন নানা ঐতিহাসিক স্মৃতি। এখন সর্বত্রই আলোচনা, সেই রাজকীয় বাসভবনের তোরণ উন্মোচিত হচ্ছে কার জন্য? তবে কি জনগণের বিপুল রায়ে নির্বাচিত হয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যমুনায় প্রবেশ করতে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান? তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, তারেক রহমান আপাতত যমুনায় উঠছেন না।

গুলশানের বাসায় থেকেই অফিসসহ অন্যান্য কাজ করবেন তিনি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন গতকাল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী গুলশানের বাসভবন থেকেই তার সব কাজ সম্পাদন করছেন। তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় উঠবেন বলে মনে হয় না। সম্ভাবনা খুবই কম। তা ছাড়া এ বিষয়ে এখনো তারা অবগত নন।’

এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে গুলশানে থাকছেন। তিনি সেখান থেকে আবদুল গণি রোডের সচিবালয় ও তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যাতায়াত করছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারি বাসভবন যমুনা ছেড়েছেন। এখন প্রধানমন্ত্রীর যমুনায় ওঠার কথা আমরা জানি। নতুনভাবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, সে ব্যাপারে আমরা অবগত নই।’

তিনি আরও বলেন, ‘মুহাম্মদ ইউনূস যমুনা ছেড়ে যাওয়ায় বেশকিছু সংস্কার করতে হবে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী যদি ওঠেন, তাহলে তার চাহিদা মতো সংস্কার করতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কাজ করছেন।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com